Breaking



বৃহস্পতিবার, ১০ জুন, ২০২১

ভারতীয় সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুলি

ভারতীয় সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুলি 

ভারতীয় সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুলি
ভারতীয় সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা 


১. রাষ্ট্রপতি ভারতের শাসনবিভাগের প্রধান। তবে তিনি নিয়মতান্ত্রিক শাসকমাত্র। প্রকৃত শাসক প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীসভা। ভারতের রাষ্ট্রপতি জনগণ দ্বারা পরােক্ষভাবে (লােকসভা, রাজ্যসভা ও বিধানসভাগুলির সদস্যদের দ্বারা বিশেষ নিয়মে নির্বাচিত) নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে কার্যকাল শেষ হওয়ার আগে সংসদ ইমপিচমেন্ট এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে পদচ্যুত করতে পারে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে উপ-রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব সামলান। তবে, ছয় মাসের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। জরুরী অবস্থায় রাষ্ট্রপতি সর্বাধিক ক্ষমতার অধিকারী হন। রাষ্ট্রপতির স্বরূপ বর্ণনা প্রসঙ্গে ড. বি.আর আম্বেদকর বলেছেন – ‘ভারতের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রেরপতি, কিন্তু শাসনবিভাগের কর্তা নন। তিনি জাতির প্রতীক, কিন্তু জাতিকে শাসন করেন না।”


২. ভারতের রাষ্ট্রপতির পরিচিতি :


যােগ্যতা ও শর্তাদি : 


  • ভারতের নাগরিক
  • অন্তত ৩৫ বছর বয়স
  • সংসদ বা রাজ্য আইনসভার সদস্য না থাকা
  • কোন লাভজনক পদে না থাকা
  • মনােনয়নপত্র ৫০ জন নির্বাচক দ্বারা প্রস্তাবিত হবে এবং অপর ৫০ জন নির্বাচক দ্বারা সমর্থিত হতে হবে।

নির্বাচক : 


ভারতীয় সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলির বিধায়কদের নিয়ে বিশেষ নির্বাচকমন্ডলী।


মেয়াদ : 


পাঁচ বছর; পুনঃ নির্বাচিত হতে পারেন।


পদশূন্য : 


১. পদত্যাগ, ২. মৃত্যু, ৩. ইনপিচমেন্ট ইত্যাদি কারণে। 


ক্ষমতা ও কার্যাবলী : 


  • শাসন সংক্রান্ত - ক) নিয়ােগ সংক্রান্ত, খ) সামরিক, গ) কুটনৈতিক
  • আইন সংক্রান্ত - ক) সংসদে সদস্য মনােনয়ন, খ) সংসদে অধিবেশন সংক্রান্ত, গ) বিলে স্বাক্ষর, ঘ) সংবিধান সংশােধনী বিলে সম্মতি, ঙ) জরুরী সংক্রান্ত প্রভৃতি।
  • বিচার সংক্রান্ত - ক) সুপ্রিম ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়ােগ, খ) ক্ষমা প্রদর্শন প্রভৃতি।
  • অর্থ সংক্রান্ত - ক) অর্থবিল, খ) বাজেট প্রভৃতি। 
  • কেন্দ্র সরকারের যাবতীয় কাজকর্ম রাষ্ট্রপতির নাম সম্পাদিত হয় 
  • তিন প্রকার জরুরী অবস্থা ঘােষণা ও তিনপ্রকার ভেটো প্রয়ােগ করার ক্ষমতা প্রভৃতি। 

ক্ষমতা

সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে তিন প্রকার জরুরী অবস্থা ঘােষণার ক্ষমতা দিয়েছে।


ক) জাতীয় জরুরী (আপতকালীন অবস্থা) ঘােষণা : 


যুদ্ধ, বিদেশি আক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘটলে বা ঘটার সম্ভাবনা থাকলে রাষ্ট্রপতি জাতীয় জরুরী অবস্থা ঘােষণা করতে পারেন। (৩৫২ ধারা) 


খ) রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন (৩৫৬ নং ধারা) ঘােষণা : 


কোন অঙ্গরাজ্যে শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা দেখা দিলে রাষ্ট্রপতি ৩৫৬ নং ধারা জারী করতে পারেন। 


গ) আর্থিক জরুরী ঘােষণা (৩৬০ নং ধারা) : 


সমগ্র ভারতে বা দেশের কোন অংশে আর্থিক পরিস্থিতি বিপন্ন হলে রাষ্ট্রপতি আর্থিক জরুরী ঘােষণা করতে পারেন। অবশ্য তিনটি জরুরী অবস্থা সংসদ কর্তৃক ২ মাসের মধ্যে অনুমােদিত হতে হবে। ভারতে এখনও| পর্যন্ত একবারও আর্থিক জরুরী (৩৬০ নং ধারা) ঘােষণা করা হয়নি। 


৪. ভারতের রাষ্ট্রপতির ‘ভেটো ক্ষমতা’ : 


রাষ্ট্রপতির বিল বাতিল করার ক্ষমতাকে ‘ভেটো ক্ষমতা’ বলে। সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে তিন প্রকার ভেটো ক্ষমতা প্রয়ােগ করার অধিকার দিয়েছে। 


ক) পূর্ণাঙ্গ ভেটো : 


অর্থবিল ও সংবিধান সংশােধন বিল ছাড়া সংসদে| পাস হওয়া যে কোন বিলে রাষ্ট্রপতি অসম্মতি জানালে বিলটি বাতিল| হয়ে যাবে। রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতাকে পূর্ণাঙ্গ ভেটো বলে।


খ) স্থগিতকারী ভেটো : 


সংসদে পাস হওয়া কোন বিল| স্বাক্ষরের জন্য তার কাছে এলে তিনি সরাসরি সম্মতি না জানিয়ে বিলটিকে পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদে ফেরৎ পাঠাতে পারেন। রাষ্ট্রপতির এই ভেটোকে স্থগিতকারী ভেটো বলে।


গ) পকেট ভেটো : 


সংসদে কোন বিল পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির কাছে আসে। বিলে সম্মতি বা অসম্মতি বা পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদে না পাঠিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিলটিকে চেপে রাখতে পারেন। রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতাকে পকেট ভেটো বলে। (সংবিধানে কোন সময়সীমা নির্দিষ্ট করা হয়নি।)



৫. রাষ্ট্রপতি যে সব পদাধিকার ব্যক্তিকে নিয়ােগ করতে। পারেন, তারা হলেন 

  • অঙ্গরাজ্যের রাজ্যপাল 
  • সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিগণ
  • ভারতের নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য সদস্যগণ 
  • ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীগণ
  • ভারতের কন্ট্রোলার ও অডিটর জেনারেল
  • আন্তঃ রাজ্য পরিষদের সদস্যগণ, 
  • রাষ্ট্রদূতগণ
  • অ্যাটনী জেনারেল প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গ। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে।

৬. ৩৫৬ নং ধারা : 


রাজ্যপালের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন যে, কোনও রাজ্যে শাসনতন্ত্রিক অচলাবস্থার উদ্ভব হয়েছে, তাহলে তিনি সংবিধানের ৩৫৬ নং ধারা অনুযায়ী ওই রাজ্যের মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিতে পারেন। এরূপ জরুরী অবস্থার ঘােষণা দু’মাসের বেশি স্থায়ী থাকে না, তবে সংসদ দ্বারা অনুমােদিত হলে ৩ বছর পর্যন্ত বলবৎ রাখা চলে। এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে ৩৫৬ ধারা ১০০ বারের বেশি ঘােষণা  করা হয়েছে। সারকারিয়া কমিশনের মতে ২৬ টি ক্ষেত্রে এই ধারা প্রয়ােগ অপরিহার্য ছিল না।

৩৫৬ নং ধারা জারী হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের শাসনক্ষমতা রাষ্ট্রপতি নিজ হাতে গ্রহণ করেন। বিধানসভা সংসদ দ্বারা পরিচালিত হয়। কেন্দ্র সরকার রাজ্যের রাজস্বকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রভৃতি।


৭. জাতীয় জরুরী (৩৫২ নং ধারা) : 


এপর্যন্ত দেশে তিনবার ঘােষণা করা হয়েছে। 

  • ক) ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ভারত-চিন সীমান্ত যুদ্ধের জন্য। 
  • খ) দ্বিতীয় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় 
  • গ) তৃতীয় ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে অভ্যন্তরীণ কারণে। 

৩৫২ নং ধারা জারী হলে ভারতের শাসনব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হতে পারে। রাষ্ট্রপতি রাজ্যকে প্রয়ােজনীয় নির্দেশ দিতে পারে। সংসদ লােকসভার মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করতে পারে। রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়ে সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারে। দু'মাসের বেশি স্থায়ী হবে না, তবে সংসদ দ্বারা অনুমােদিত হলে কয়েকমাস থাকতে পারে।

৮. ৩৬০ নং ধারার কুফলগুলি হল : 


রাষ্ট্রপতি রাজ্যগুলিকে আর্থিক বিষয়ে নির্দেশ দিতে পারেন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা হ্রাস হতে পারে। রাজ্যের অর্থ সংক্রান্ত গৃহীত প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির ‘ভেটো ক্ষমতার অধীনে আসে প্রভৃতি। দু’মাসের বেশী স্থায়ী হবে না, সংসদ দ্বারা অনুমােদিত হতে হবে। এখন পর্যন্ত ভারতে একবারও ৩৬০ নং ধারা জারী হয়নি।

৯. অর্ডিন্যান্স জারীর ক্ষমতা : 


রাষ্ট্রপতির আইন পল | সংক্রান্ত ক্ষমতার মধ্যে তার অর্ডিন্যান্স (Ordinance) জারী করার ক্ষমতা আছে। সংসদের অধিবেশন বন্ধ থাকাকালীন (১১৩ নং ধারা) | রাষ্ট্রপতি অর্ডিন্যান্স জারী করতে পারেন, সংসদে পরে অনুমােদিত হলে অধিবেশন শুরু হওয়ার দিন থেকে ছয় সপ্তাহ পরে তা বাতিল হয়ে যাবে। দেশে এ পর্যন্ত বহুবার রাষ্ট্রপতি অর্ডিন্যান্স জারী করেছেন।

১০. ইমপিচমেন্ট’ : 


সংবিধানের ৬১ নং ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদচ্যুতির পদ্ধতিকে ‘ইমপিচমেন্ট (impeachment) বলে। সংসদের (লােকসভা ও রাজ্যসভা) যে কোন কক্ষই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্রস্তাব আকারে সংবিধানভঙ্গের অভিযােগ আনতে পারে। যে কক্ষে এরূপ অভিযােগ প্রস্তাব আনীত হবে, সেই কক্ষের মােট সদস্যের এক চতুর্থাংশের স্বাক্ষরিত লিখিত নােটিশ দেওয়ার অন্তত ১৪ দিন পরে প্রস্তাবটি আলােচনার জন্য সংশ্লিষ্ট কক্ষে উত্থাপন করা যায়। প্রস্তাবটি সেই কক্ষের মােট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতিসূচক ভােটে গৃহীত হলে এবং অপরকক্ষে ( প্রস্তাবটি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভােটে গৃহীত হলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা যায়।

১১. রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যগুলির বিধানসভার সদস্যরা অংশগ্রহণ করলেও রাষ্ট্রপতির পদচ্যুতির ব্যাপারে কোন এক্তিয়ার নেই। সংসদের মনােনীত সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভােট দিতে না পারলেও রাষ্ট্রপতির পদচ্যুতির ব্যাপারে তাদের ভােটাধিকার আছে।


আরও কিছু তথ্য 

  • ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ। 
  • রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের বিধায়কদের একটি ভােটের মূল্য ১৫১ [৪,৪৩,১২,০১১-২৯৪)-১০০০+১]। ২০২৬ খ্রিস্টাব্দের পর ভােটের মান পরিবর্তন হতে পারে। 
  • রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নির্বাচকদের ভােটের মূল্য ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের জনগণনা অনুযায়ী ধরা হবে। (৮৪তম সংবিধান সংশােধন)। 
  • রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিতর্ক সৃষ্টি হলে সুপ্রিমকোর্ট মীমাংসা করবে। 
  • দ্বিতীয় পছন্দের ভােটে ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন ভি. ভি. গিরি। 
  • রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। 
  • রাষ্ট্রপতিকে ভারতের প্রথম নাগরিক বলা হয়।
  • যুদ্ধ ঘােষণা বা শান্তি স্থাপন রাষ্ট্রপতি সম্পাদন করে থাকেন। 
  • স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানদের রাষ্ট্রপতি নিয়ােগ করেন।
  • ৩৫৬ নং ধারা সর্বপ্রথম পাঞ্জাবে (১৯৫১ খ্রিঃ) জারী হয়েছিল। 
  • পশ্চিমবঙ্গে এপর্যন্ত চারবার ৩৫৬ নং ধারা জারী হয়েছে।
  • পাঞ্জাবে সবচেয়ে বেশিদিন (পাঁচবছর) ৩৫৬ নং ধারা জারী ছিল। 
  • প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ােগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য নেই।
  • জরুরী অবস্থা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি ছাড়া রাষ্ট্রপতি জারী করতে পারেন না।
  • রাষ্ট্রপতি হলেন নাম সর্বস্ব শাসক, প্রকৃত শাসক হলেন প্রধানমন্ত্রী। 
  • রাজেন্দ্র প্রসাদ একমাত্র রাষ্ট্রপতি, যিনি দুটি মেয়াদ এই পদে ছিলেন। 
  • রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন মারা যান ড. জাকির হােসেন। 
  • ভারতে এ পর্যন্ত কোনও রাষ্ট্রপতি দ’বারের বেশি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হননি। (আইনে কোন নিষেধ নেই)। 
  • প্রণব মুখােপাধ্যায় ভারতের ত্রয়ােদশ (২০১২ খ্রিঃ) নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। 
  • ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রথম মহিলা প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন লক্ষ্মী সায়গল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন